Politicians,

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেসেপ তাইয়েপ এরদোগান

2
Shares

১৯৫৪ সালে তুরস্কের ইস্তানবুলে জন্মগ্রহণকারী কোস্টগার্ড পিতার সন্তান রেসেপ তাইয়েপ এরদোগান বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার সময় রাজনীতিতে জড়িয়ে পরেন। ইসলামপন্থী এই নেতা ইস্তানবুলের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর ধর্মীয় বিরোধ উস্কে দেওয়ার অভিযোগে কারাদণ্ড ভোগ করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য তিনি সমালোচিত হয়েছেন বারবার, শিকার হয়েছেন নানান প্রতিবন্ধকতার। তবুও দৃঢ় মনোবল আর ধৈর্য তাকে নিয়ে গেছে ক্ষমতার চূড়ায়।

প্রতিভাবান ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে শীর্ষস্থানীয় ক্লাবগুলোর মনোযোগ কেড়েছিলেন এরদোগান; Image Source: huffpost.com

প্রারম্ভিক জীবন

১৩ বছর বয়সে ইস্তানবুল ফিরে আসার আগে শৈশবের একটা বড় অংশ কাটিয়েছেন রিজে, যেখানে তার বাবা কোস্টগার্ড হিসেবে কাজ করতেন। দারিদ্রের মধ্যে বেড়ে ওঠা এরদোগান কিশোর বয়সে রাস্তায় শরবত এবং রুটি বিক্রি করে পরিবারকে অর্থনৈতিক ভাবে সহায়তা করেছেন। একজন প্রতিভাবান ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবেও তিনি ছিলেন অতুলনীয় এবং শীর্ষস্থানীয় ক্লাবগুলোর মনোযোগ কেড়েছিলেন। কিন্তু বাবার নিষেধের কারণে ফুটবলের মাঠে আর দৌড়ানো হয়নি তার। এরদোগান এরপর ইস্তানবুল ইমাম হাটিপ স্কুলে যোগ দেন এবং তুর্কি জাতীয় ছাত্র সমিতির সাথে যুক্ত হন। সেখান থেকেই ডিপ্লোমা অর্জন করেন।

ফুটবলার ওজিলের বিয়ের অনুষ্ঠানে এরদোগান; Image Source: barta24.com

রাজনৈতিক জীবন

জাতীয় স্যালভেশন পার্টির নেতা নেকমেটিন ইরাকাকানের দ্বারা প্রভাবিত এরদোগান ১৯৭৬ সালে দলের ইস্তানবুল যুব শাখার প্রধান নির্বাচিত হন। ১৯৮০ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দলটি বিলুপ্ত হলে স্নাতক ডিগ্রী অর্জনের জন্য ১৯৮১ সালে মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও প্রশাসন অনুষদে ভর্তি হন তিনি। স্নাতক শেষ করার পর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একাউন্টেন্ট এবং ম্যানেজার হিসেবে কাজ শুরু করেন।

১৯৮৩ সালে এরদোগান ওয়েলফেয়ার পার্টিতে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে পুনরায় রাজনীতিতে ফিরে আসেন, ১৯৮৪ সালে বায়োগুলু জেলা প্রধান নির্বাচিত হন। পরের বছর তাকে ইস্তানবুল প্রাদেশিক প্রধান নির্বাচিত করা হয়। ১৯৮৯ সালের পৌর নির্বাচনে দলের সাফল্যের জন্য এরদোগানকে অন্যতম ভূমিকা পালন করেন।

জাতীয় স্যালভেশন পার্টির নেতা নেকমেটিন ইরাকাকানের দ্বারা প্রভাবিত এরদোগান ১৯৭৬ সালে দলের ইস্তানবুল যুব শাখার প্রধান নির্বাচিত হন; Image Source:khulnatv.com

ইস্তানবুলের মেয়র নির্বাচিত ও কারাগারে বন্দি

রেসেপ তাইয়েপ এরদোগান ১৯৯৪ সালে ইস্তাম্বুলের মেয়র নির্বাচিত হন। এরপর নগর আধুনিকীকরণ, পানির অভাব দূরীকরণ, দূষণ রোধ এবং অবকাঠামোগত ঝুঁকি সফলভাবে মোকাবেলা করেন। কিন্তু শহরের ক্যাফে থেকে মদ নিষিদ্ধ করে ধর্মীয় রোষের মুখে পরেন। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে, একটি ইসলামিক কবিতা চয়নের পর এরদোগান গুরুতর অগ্নিকাণ্ডের শিকার হন। এরপর পরই তাকে মেয়র পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং ১৯৯৯ সালে চার মাসের জন্য কারাগার বরণ করতে হয়।

মসজিদগুলো আমাদের ব্যারাক,

গম্বুজগুলো আমাদের হেলমেট,

মিনারগুলো আমাদের বেয়োনেট

এবং বিশ্বস্ত আমাদের সৈন্যদল।

১৯৯৭ সালে এক বক্তৃতায় এই কবিতাটি আবৃতি করে ধর্মীয় রোষের মুখে পরেন এরদোগার

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে এরদোগান ; Image Source: ittefaq

প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত

হাজত বাস শেষে এরদোগান ২০০১ সালে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) প্রতিষ্ঠা করেন। একেপি ২০০২ সালের নির্বাচনে জয় লাভ করে এবং এরদোগান সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় আসীন হন।  ৯ মার্চ, ২০০৩ তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং ২০১৪ পর্যন্ত এই পদেই ছিলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এরদোগান তুরস্কের উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধন করেন। মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস, বিদেশী বিনিয়োগ উৎসাহিত করার মাধ্যমে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেরও উন্নতি সাধন করেন। ২০১৩ সালে একাধিক সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানো হয় একেপি উচ্ছেদ পরিকল্পনা করার জন্য। পরবর্তী বছর সোশ্যাল মিডিয়া অপব্যবহারের কারণে তিনি তুরস্কে টুইটার এবং ইউটিউব ব্যবহার সীমিত করে দেন।

২৪ জুন, ২০১৮ সালে তুরস্কের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একসাথে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়; Image Source:dailyxing.com

প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ

প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রথম সরাসরি নির্বাচনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। যদিও আগেই তিনি ক্ষমতার চূড়ায় ছিলেন, এরদোগান চেয়েছিল প্রেসিডেন্ট হিসাবে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু ২০১৫ সালের নির্বাচনে একেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে তার লক্ষ্য সাময়িকভাবে বাধার সম্মুখীন হয়। পরবর্তীতে জোট সরকার গঠন করার মাধ্যমে একেপি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে।

পরিবারের সাথে ছুটি কাটানোর সময় ১৫ জুলাই, ২০১৬ তুরস্কে একটি সামরিক অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। এরদোগান যে হোটেলে ছিল তা আক্রান্ত হলেও তিনি ইস্তানবুলে সফলভাবে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর ভিডিও চ্যাট অ্যাপ্লিকেশন ফেইসটাইম এ তিনি তার দেশবাসীর প্রতি আহবান জানান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই অভ্যুত্থানে ৪০০র বেশি মানুষের মৃত্যু এবং ১৪০০ মানুষ আহত হন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাসিত তুর্কী উপজাতি নেতা ফিতুল্লাহ গুলেনের উপর এই হামলার দায়ভার গিয়ে পরে। হাজার হাজার সামরিক কর্মীকে কারাগারে পাঠানোর পাশাপাশি হাজার হাজার পুলিশ কর্মকর্তা, বিচারক, সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষক আটক রাখা হয় এ ঘটনায়। এরপর তিনি রাষ্ট্রে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন।

এরদোগান একটি বক্তৃতায় আমেরিকাকে বয়কট করারও আহবান জানান; Image Source: newspapers71

দ্বিতীয় মেয়াদে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত

২৪ জুন, ২০১৮ সালে তুরস্কের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একসাথে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আবারো নির্বাচিত হন আধুনিক তুরস্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই রাজনীতিবিদ। ক্ষমতায় আরোহণের পর ৪ জুলাই, ২০১৮ তুরস্কে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আরো বাড়িয়ে একটি ডিক্রি জারি করে দেশটির সরকার। যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বলে বিবেচিত হবে এবং বিলুপ্ত করা হয় প্রধানমন্ত্রীর পদ। প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্টের কোনোরূপ অনুমোদন ছাড়াই মন্ত্রীপরিষদের সদস্য নির্বাচন এবং ক্ষমতাচ্যুত করার পাশাপাশি সরকারি বেসামরিক কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারীকে বাদ দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। বিপুল নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ে ৯ জুলাই, ২০১৮ এরদোগান তুরস্কের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ গ্রহণ করেন।

তুরস্ক ৯০% ভোট দিয়ে গণতন্ত্রের এক নতুন উদাহরণ তৈরি করেছে। আশা করি কেউ তাদের ব্যর্থতা গোপন করতে উৎসাহিত হবেন না।

২৪ জুন নির্বাচনের রাতে যখন জয় অনেকটাই এরদোগানের দিকে নির্দেশ করছিল তখন তিনি এক ভাষণে এ কথা বলেন।

পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবার পর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এরদোগান তুরস্কে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের উত্তরে তুরস্কে মার্কিন পণ্যের উপর শুল্ক জারি করেন। যার মধ্যে গাড়ি ও মদ অন্তর্ভুক্ত। এরদোগান একটি বক্তৃতায় আমেরিকাকে বয়কট করারও আহবান জানান।

Feature Image: dailyxing.com