World Heros,

১৬ বছর বয়সী জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থানবার্গ

2
Shares

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে আমরা কম-বেশি সবাই জানি। তারপরও একটু বলি, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে দুইমেরুর বরফ গলতে শুরু করেছে অনেক আগে থেকেই। এর কারণে সমদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে উপকূলবর্তী অনেক এলাকা বিলীন হয়ে যাবে সমুদ্র গর্ভে। ২০৫০ সাল নাগাদ প্রায় তিন কোটি মানুষ হয়ে পরবে গৃহহীন।

এনএফসিসিসি’র দেয়া তথ্যমতে, বিংশ শতাব্দিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা গড়ে ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। আরো ১৮-৫৯ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়লে মালদ্বীপসহ উপকূলবর্তী দেশগুলোও তলিয়ে যাবে। যার মধ্যে বাংলাদেশও আছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে ২০৫০ সালের মধ্যে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশে অন্তত ১৭% ভূমি সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে৷

Image Source: insider.com ; ১৬ বছর বয়সী সুইডিশ জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থানবার্গ

খুব ভয়াবহ খবর, তাই না? নিশ্চয়ই খুব চিন্তা হচ্ছে। আশপাশে কেউ থাকলে হয়তো আলোচনাও শুরু করে দিয়েছেন। আমরা সবাই তাই করি। কিন্তু এর বাইরেও যে কিছু করার আছে। আমরা সাধারণ মানুষেরাও যে চাইলে অনেক কিছুই করতে পারি তাই দেখিয়ে দিয়েছেন ১৬ বছর বয়সী সুইডিশ জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থানবার্গ।

কে এই গ্রেটা থানবার্গ?

গ্রেটা থানবার্গ একজন সুইডিশ জলবায়ু কর্মী। ২০১৮ সালে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য আন্তর্জাতিক আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন এই কিশোরী। পোস্টার বোর্ডে হাতে লেখা ‘জলবায়ুর জন্য স্কুল ধর্মঘট‘ এই সরল বার্তা দিয়ে থানবার্গ শুক্রবারে স্কুল বাদ দিয়ে সুইডিশ সংসদের বাইরে প্রতিবাদ শুরু করে।

খুব দ্রুত তার এই অভিনব আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে। তার জন্য অবশ্য ধন্যবাদের দাবীদার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো। তার এই প্রতিবাদ সারা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ যুবক-যুবতীকে সংগঠিত হয়ে প্রতিবাদ করতে প্রভাবিত করে।

ফ্রাইডে ফর ফরচুন এর মাধ্যমে থানবার্গ এবং ইউরোপের অন্যান্য পরিবেশ সচেতন যুবক-যুবতীরা জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে নেতাকর্মী এবং আইন প্রণেতাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছেন।

Image Source: twitter.com; পরিবারের সাথে গ্রেটা

থানবার্গ বিশ্ব ভ্রমণ করেছেন, নেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন, জলবায়ু সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান এবং প্যারিস চুক্তি পুনরায় কার্যকর করার দাবিতে সম্মেলন করেছেন। সম্প্রতি এস্পারগার্স সনাক্ত হবার পর, এই কর্মী প্রকাশ্যে তার অসুস্থতা সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করেন এবং এটিকে তার ‘সুপারপাওয়ার‘ হিসাবে উল্লেখ করে।

প্রথম জীবন

থানবার্গ, ৩ জানুয়ারি, ২০০৩ সালে সুইডেনের স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করে। থানবার্গ মাত্র ১৫ বছর বয়সে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আন্দোলন শুরু করে। থানবার্গ একটি শিল্পমনা পরিবারে বেড়ে ওঠে। তার মা, মালেনা এর্নম্যান একজন অপেরা গায়িকা এবং তাঁর বাবা সান্তে থানবার্গ একজন অভিনেতা। তার ছোট বোন বিটা সুইডেনের জনপ্রিয় গায়িকা। বোনের মতো বিটাও এডিএইচডি এবং ওসিডির মতো ব্যাধিগুলোর সাথে তার অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।

জলবায়ু আন্দোলন

থানবার্গে যখন মাত্র আট বছর বয়স, তখন সে প্রথম জলবায়ু সংকট সম্পর্কে জানতে পারে। তারপর থেকে সে প্রতিদিনের জীবনযাপনে কিভাবে কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারে তা নিয়ে কাজ শুরু করে। জলবায়ু আন্দোলনের আলোচিত মুখ হিসাবে, থানবার্গকে স্টকহোম, লন্ডন এবং ব্রাসেলস সহ অসংখ্য সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে, পোল্যান্ডের ক্যাটওয়াইসে জাতিসংঘের কপ-২৪ সম্মেলনে দেওয়া থানবার্গের ভাষণ তাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। সম্মেলনে সেক্রেটারি-জেনারেলকে সম্বোধন করে সে বলে, “আপনি এটা সম্পর্কে বলার মতো যথেষ্ট পরিণত নন। এই বোঝা আপনি বাচ্চাদের উপর ছেড়ে দিন। কিন্তু আমি জনপ্রিয় হওয়ার জন্য আগ্রহী নই। আমি ন্যায়বিচার চাই এবং এই গ্রহের প্রতি যত্নশীল হওয়ার আহ্বান জানাই।”

Image Source: people.com ; কপ-২৪ সম্মেলনে দেওয়া থানবার্গের ভাষণ তাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে,  নিউ ইয়র্ক সিটিতে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্পর্কিত শীর্ষ সম্মেলনে বক্তৃতার জন্য আমন্ত্রিত থানবার্গ, আটলান্টিক পাড়ি দেন নৌকায় চড়ে। এসময় তার বাবা এবং একজন সমর্থনকারী ছিলেন তার সাথে। দু’সপ্তাহের বেশি সময় নিয়ে নৌকাটি ২৮ শে আগস্ট নিউইয়র্ক সিটিতে পৌঁছে এবং সেখান থেকে থানবার্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে দেখা করেন।

পরে ১৮ ই সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি এবং হাউস সিলেক্ট কমিটির সামনে বক্তব্য রাখে গ্রেটা। থানবার্গ তার কথা বলার ধরনের জন্য সুপরিচিত হয়ে উঠেন। থানবার্গ নিজের বক্তব্যের পরিবর্তে জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদন তুলে ধরে। সে বলে,’আমি চাই না আপনারা আমার কথা শোনেন। আমি চাই আপনারা বিজ্ঞানীদের কথা শোনেন।’

Image Source: newsweek.com ; ১৮ ই সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটি এবং হাউস সিলেক্ট কমিটির সামনে বক্তব্য রাখে গ্রেটা

এনওয়াইসির ঐতিহাসিক প্রতিবাদ

২০শে সেপ্টেম্বর, নিউ ইয়র্ক সিটির গ্লোবাল ক্লাইমেট প্রোটেস্টে লক্ষাধিক বিক্ষোভকারীর সাথে থানবার্গ প্রতিবাদে অংশ নেয়। এই বিক্ষোভ ইতিহাসের বৃহত্তম জলবায়ু আন্দোলনে পরিণত হয় এবং সারা বিশ্বে মোট ৪ মিলিয়ন লোক মিছিল করে।

রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া

থানবার্গের ‘এতো সাহস তোমার’ বক্তব্যটি এতটাই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যে তিনি এটা নিয়ে একটি টুইট করেন। ট্রাম্প লেখেন গ্রেটা থানবার্গকে দেখে একজন সুখী কিশোরী মনে হয় যে একটি উজ্জ্বল এবং দুর্দান্ত ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় সামনে এগিয়ে চলেছে।

থানবার্গ তার জবাবে ট্রাম্পের ভাষা ব্যবহার করে তার টুইটারের বায়ো পরিবর্তন করে ‘ একজন সুখী কিশোরী, যে একটি উজ্জ্বল এবং দুর্দান্ত ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় সামনে এগিয়ে চলে’ লেখেন।

Image Source: CNBC.com ; থানবার্গের ‘এতো সাহস তোমার’ বক্তব্যটি এতটাই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যে তিনি এটা নিয়ে একটি টুইট করেন

নোবেল শান্তি পুরস্কার

মার্চ ২০১৯ সালে, থানবার্গ জলবায়ু সম্পর্কিত সক্রিয়তার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়। তবে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের কাছে এই পুরষ্কার হারান এই স্বপ্নবাজ কিশোরী।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

জলবায়ু সংক্রান্ত ক্রিয়াকলাপ চালানোর জন্য থানবার্গ স্কুল থেকে এক বছরের অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরিবেশবাদী কর্মীদের সাথে দেখা করার জন্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলো প্রত্যক্ষ করার জন্য মেক্সিকো, কানাডা এবং দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণ করার পরিকল্পনা করছে থানবার্গ। এ বছরের  ডিসেম্বরে চিলিতে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত সম্মেলনেও (কপ-২৫) যোগ দিতে চলেছে গ্রেটা।

এই হলো গ্রেটা থানবার্গ। ১৬ বছরের এই ছোট্ট মেয়েটি আমাদের শিখিয়েছে একার প্রতিবাদও অনেক কিছুই বদলে দিতে পারে।

Feature Image: real-economics.blogspot.com