Politicians,

২য় বিশ্বযুদ্ধের মরুভূমির শিয়াল ফিল্ড মার্শাল এরউইন রোমেল

25
Shares

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির সর্বাধিক জনপ্রিয় জেনারেলদের মধ্যে একজন ফিল্ড মার্শাল এরউইন রোমেল। আফ্রিকার অভিযানগুলোতে বীরত্বসূচক জয়ের মাধ্যমে তিনি প্রশংসিত হন। হিটলারের জেনারেল হিসেবে রোমেল বেশ আলোচিত হলেও, হিটলারের যুদ্ধবাজ জেনারেল নয় বরং একজন দেশপ্রেমিক হিসেবেই তিনি অধিক পরিচিত।

জার্মানদের মধ্যে তিনি  ‘পিপলস মার্শাল’ নামে পরিচিত। তিনি  অ্যাডলফ হিটলারের সবচেয়ে সফল জেনারেল। কিন্তু ভাগ্যের চক্রে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে ১৪ অক্টোবর ১৯৪৪ সালে ৫২ বছর বয়সে জার্মানির হেরলিংজেনে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন।

এরউইন রোমেল ছিলেন জার্মানির সর্বাধিক জনপ্রিয় জেনারেলদের মধ্যে একজন; Image Source: history.com

ঘাম রক্ত বাঁচায়।

এরউইন রোমেল

প্রাথমিক জীবন

এভারউইন রোমেলের জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৮৯১ সালে জার্মানির হেডেনহেমে। শিক্ষক পিতার সন্তান রোমেল ১৯১০ সালে জার্মান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লেফটেন্যান্ট হিসেবে ফ্রান্স, রোমানিয়া ও ইতালিতে যুদ্ধ করেন। বিশ্বযুদ্ধের পর কোনো ধরণের প্রভাবক ব্যবহার করে সামরিক বাহিনীতে পদোন্নতি প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।

সবচেয়ে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত, সব ধরণের প্রস্তুতি নেওয়া শত্রু বাহিনীর সাথেও  এমন ভাবে লড়াই করবে যেন সফলতার শতভাগ সম্ভাবনা শুধু তোমারই।

এরউইন রোমেল

১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারীতে ৭ম পাঞ্জার বিভাগের কমান্ডার পদে নিযুক্ত হন রোমেল । পরের বছর  তিনি উত্তর আফ্রিকায় জার্মান বাহিনীর কমান্ডার নিযুক্ত হন। উত্তর আফ্রিকাতে জার্মান বাহিনী ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হলে অ্যাডলফ হিটলার রোমেলকে লিবিয়াতে পাঠিয়ে দেন, যেখানে তিনি এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর ১৯৪১ পর্যন্ত টোবার্কের বন্দর শহর অবরোধ করে রাখেন।

শিক্ষক পিতার সন্তান রোমেল ১৯১০ সালে জার্মান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লেফটেন্যান্ট হিসেবে ফ্রান্স, রোমানিয়া ও ইতালিতে যুদ্ধ করেন; Image Source: ww2db.com

ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে পুনরায় পরাজিত হলে ১৯৪২ সালে আবারো আফ্রিকায় নিযুক্ত হন এবং সেখানে জার্মানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন। এই যুদ্ধ গাজার যুদ্ধ হিসাবে পরিচিত। এর অল্পদিন পরেই তিনি ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত হন।

সামনে থেকে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে জয় ছিনিয়ে আনার জন্য বিখ্যাত ফিল্ড মার্শাল রোমেল। যেখানে অন্য জেনারেলরা সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণের চেয়ে সাধারণ সৈন্যদের ব্যবহার করতে বেশী পছন্দ করতো, সেখানে রোমেল ছিল একেবারেই ব্যতিক্রম। যার কারণে তিনি ছিলেন অধিক প্রশংসিত এবং সকলের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র।

মরুভূমি মহাদেশ আফ্রিকায় তার বিস্ময়কর আক্রমণ এবং অভাবনীয় সাফল্যের জন্য তিনি ডেজার্ট ফক্স (মরুভূমির শিয়াল) উপাধি পান। তিনি ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হবার জন্য লড়াইয়ে একজন যোদ্ধা হিসেবে আরব বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

যে সাহস সামরিক কৌশলের বিরুদ্ধে যায় তা নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছু নয়।

এরউইন রোমেল

মরুভূমি মহাদেশ আফ্রিকায় বিস্ময়কর আক্রমণ এবং অভাবনীয় সাফল্যের জন্য ‘ডেজার্ট ফক্স (মরুভূমির শিয়াল) ’ উপাধি পান; Image Source: rarehistoricalphotos.com

এল আলামাইনের পরাজয়

ফিল্ড মার্শাল রোমেলের সাফল্য অভাবনীয় হলেও ছিল সল্প সময়ের। গাজার যুদ্ধের মাত্র পাঁচ মাস পর, ১৯৪২  সালে ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে মিসরের এল আলামাইনে শহরের কাছে এক যুদ্ধে পরাজিত হন তিনি। ১৯৪৩ সালে উত্তর আফ্রিকার পরাজয়ের পর তাকে আটলান্টিক উপকূলে প্রতিরক্ষা তত্ত্বাবধানে পাঠানো হয়।

১৯৪৪ সালের শুরুর দিকে, ফরাসি চ্যানেল উপকূলের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিরোধে দায়িত্ব দেওয়া হয় রোমেলকে। এই সময়েই, হিটলারের শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে রোমেল সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করেন এবং তার বন্ধুদের একটি গোষ্ঠী তাকে বলেছিলেন যে হিটলার উৎখাত হওয়ার পর রোমেলের জার্মানদের নেতৃত্ব দেওয়া উচিত। কিন্তু রোমেল এই প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন।

হিটলারের শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে রোমেল সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করেন; Image Source: bbc.com

মুখোমুখি যুদ্ধে বিজয়ী সেই, যার ম্যাগাজিনে বাড়তি এক রাউন্ড গুলি থাকবে।

এরউইন রোমেল

জুলাই ১৯৪৪, ষড়যন্ত্র

১৯৪৪ সালের জুনে জোটবদ্ধ আক্রমণ এবং ফ্রান্স জুড়ে সংঘটিত সংঘর্ষের পর রোমেল বুঝতে পেরেছিলেন জার্মানরা যুদ্ধে পরাজিত হবে এবং অন্য কর্মকর্তাদের সাথে আত্মসমর্পণ করার বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি।

১৯৪৪ সালের ৬ জুন, ১৫৬০০০ সৈন্য নরম্যান্ডে অবতরণ করে এবং জার্মান বাহিনীকে আক্রমণ করে। যৌথ বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা অবশেষে ১ মিলিয়নে পৌছায় এবং ইউরোপ থেকে জার্মানদের উৎখাত করে। ইতিহাসে এই ঘটনাটি ‘দি ডি ডে’ নামে পরিচিত।

এরপর ২০ জুলাই ১৯৪৪ সালে হিটলারকে হত্যা চেষ্টা করা হয়। ষড়যন্ত্রকারীরা রোমেলের সাথে তাদের যোগাযোগ থাকার কথা প্রকাশ করে। তবে রোমেল কখনোই এই ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত ছিলেন না। এভাবেই হিটলারকে উৎখাত করার চক্রান্তে তাকে জড়ানো হয়।

রোমেল পাবলিক ট্রায়াল এড়াতে এবং পরিবারকে রক্ষা করার জন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। হিটলার হত্যা চক্রান্তে তিনি কখনোই অংশ নেননি কিন্তু তার একাধিক পরাজয় হিটলারের মনে তার বিরুদ্ধে বিরূপ ধারণা তার করুন পরিণতির প্রধান কারণ হয়ে দাড়ায়।

রোমেল পাবলিক ট্রায়াল এড়াতে এবং পরিবারকে রক্ষা করার জন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়; Image Source: autographs.org.uk

যে যুদ্ধে জয়ের অর্জন শূন্য সে যুদ্ধে লড়াই করার কোনো মানে হয় না।

এরউইন রোমেল

১৯৪৪, ১৪ অক্টোবর জার্মান অফিসাররা তাকে বাড়ি থেকে দূরে নিয়ে যান। সেখানে তিনি সায়ানাইড ক্যাপসুল কামড়ে আত্মহত্যা করেন। এ সময় তার বয়স ছিল ৫২ বছর। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

হিটলারের প্রতি দীর্ঘদিনের আনুগত্যের কারণে অনেকে তাকে নাৎসি বলে আখ্যায়িত করেন। আবার মৃত্যুর ধরণের কারণে অনেকে তাকে শহীদ হিসেবেও বর্ণনা করেন। কিন্তু এর কোনোটিই রোমেল ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান দেশপ্রেমিক জার্মান সৈনিক।

Feature Image : documentarytube.com